গ্রিস সফরনামা;পর্ব:২

রনি আমাকে তাগাদা দিয়ে রীতিমত দৌড় দিলো, আমি হাঁটতে হাঁটতে ওর পেছনে পড়ে রইলাম আর শুনলাম মাইকে আমাদের নাম ভেসে আসতেছে  “Akter & Roni, come to the gate number A8 as soon as possible”.

গেটের কাছে গিয়ে দেখি আমরাই সর্বশেষ যাত্রী, আরেকটু দেরী করলে  প্লেন মিস  হয়ে যেত। প্লেনের দরজার কাছে দাড়িয়ে আছি, আমাদের সামনে মানুষের বিশাল লাইন।মানুষজনের কথায় পুরো প্লেন গমগম করছে, কিন্তু কিছুই বুঝতে  পারছিনা ওদের ভাষা। চোখের দেখায় আর ওদের কথার ভঙ্গিমায় আন্দাজ করে নিলাম হয়তো ওরা বলছে-  “আরে ভাই আপনি আমার জায়গায় লাগেজ রাখসেন ক্যান, লাগেজ নিয়া পিছে যান”। “এই পাবলিক দেখি আবার আমার সিটে বসে আছে, ভাই সিট ছাড়েন”। মানে পুরাই ধুন্ধুমার কান্ড। আমরা একটু একটু করে আগাচ্ছি, সিট পর্যন্ত পৌছাতে আমাদের প্রায় সাত আট মিনিট লাগলো। সিটে বসে চোখটা বন্ধ করে একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেললাম।যাক,শেষ পর্যন্ত যাচ্ছি তাহলে স্বপ্নের নগরীতে। প্লেন আকাশে ভাসল রাত ১০.০৫ মিনিটে, পেছনে পরে রইলো নিয়ন আলোয় মোড়ানো মিউনিখ শহর।

শুনেছিলাম গ্রিকরা নাকি প্রচণ্ড রকমের কথা প্রিয় মানুষ। এরা এক কাপ চা হাতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পার করে দিতে পারে গল্পের ছলে। প্রমান পেয়েছি যখন দেড় ঘণ্টার ফ্লাইটে চারপাশ থেকে কেবল ওদের কথা কানে আসতে লাগলো, চোখ বন্ধ করে ঘুমের রাজ্যে ডুব দিবো সেই উপায় নাই। প্লেন যখন ল্যান্ড করলো গ্রিক হিসেবে সময় তখন রাত ১ টা। এয়ারপোর্টে পা দিয়ে অবাক হয়ে এদিক সেদিক তাকাচ্ছি। গ্রিক ভাষা অপরিচিত হলেও কিছু বর্ন কিন্তু আমাদের সবার পরিচিত, সেগুলোই যেন বেশি বেশি চোখে পড়তে লাগলো। আমি মুখ ফসকে বলে ফেললাম-  “আরেহ,ইটা বিটার দেশে চলে আসছি”। এদিক সেদিক তাকিয়ে যেটা বুঝলাম, ওরা “র” এর উচ্চারন করে “প” এর মতো। মানে, রনির নাম এখন থেকে পনি। লাগেজ সংগ্রহ করে এয়ারপোর্ট থেকে বের হতে হতে প্রায় দুইটা বেজে গেলো। আমরা যাদের বাসায় উঠবো সেই ভাইয়ার নামও রনি। তাদের বাসা এয়ারপোর্ট থেকে চল্লিশ কিমি দূরে। রনি ভাই বলল X95 বাস ধরে তার বাসা পর্যন্ত যেতে। কিন্তু এত রাতে বাস স্টেশনে অপেক্ষা করা, দেড় ঘণ্টা লাগিয়ে বাস জার্নি করা আমাদের কাছে সুবিধার মনে হলো না, তাছাড়া দুজনেই ঘুমে ঢুলো ঢুলো করছি, এই অবস্থায় বাসের জন্য অপেক্ষা করা কঠিন। লাভ লোকসানের হিসান নিকাশ করে সিদ্ধান্ত হলো ট্যাক্সি ধরবো। এখানে ট্যাক্সিতে চড়ার নিয়ম আমাদের দেশের মতো না। মানে আমার ইচ্ছামত আমি কোন একটা ট্যাক্সি ডেকে উঠে বসলাম, অথবা ট্যাক্সিওয়ালা যাবে কি যাবে না, এ নিয়ে বাক বিতণ্ডা করলাম, এমনটা না। এয়ারপোর্ট থেকে সামান্য দূরে লাইন ধরে অনেকগুলা ট্যাক্সি দাঁড়ানো থাকে।মজার ব্যাপার, যারা ট্যাক্সিতে চড়বে তারাও লাইন ধরে আগায়, কোন বিশৃঙ্খলা নাই। আপনি লাইন মেইন্টেইন করে গাড়িতে উঠে বসে তারপর ড্রাইভার কে বলবেন কোথায় যেতে চান, আপনাকে ওখানেই নামিয়ে দিয়ে আসবে। তো আমরা উঠলাম এক বুড়া চাচার গাড়িতে। ওদিকে ইভা আপু, রনি ভাই, আর ঐযে বললাম রিখিয়া পরিবার আগেই পৌঁছে গেছে, সবাই আমাদের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলো। রনি ওদের ফোন দিয়ে বলে রাখলো আমরা পৌঁছে কিছু খাবো না, সবার সাথে হাই হ্যালো পর্ব সেরে সরাসরি ঘুমাতে যাবো। তারপর মোবাইলে লোকেশন শেয়ার দিয়ে চুপচাপ বসে থাকলো। আর আমি জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে এথেন্স নগরের সাথে পরিচিত হবার চেষ্টা করছি। খুব পরিচিত শহরও মাঝে মাঝে বড্ড বেশি অচেনা লাগে, আর এই শহর তো এমনিতেও অচেনা। রাতের আধারে কেমন যেন থমথমে মনে হচ্ছে এথেন্সের চারপাশ।

তিরিশ মিনিটের পথ পাড়ি দিয়ে আমার যখন এসে পোঁছালাম রাত তখন ২.৩০। তারপর কিসের ঘুম, গা এলিয়ে এই যে সোফায় বসলাম, এক বসায় রাত ৪.৩০। বহুদিন পর পুরনো বন্ধুদের সাথে দেখা হওয়ার আনন্দে ঘুম উবে গেলো সবার। রিখিয়ারা প্রায় বারো ঘণ্টা জার্নি করে এসে ক্লান্তি ভরা চোখ নিয়ে যে এখনো জেগে আছে এটাই অবাক হওয়ার বিষয়। বলে রাখি, রিখিয়া এই গ্রুপের সর্বকনিষ্ঠ সদস্য। ও হচ্ছে মারুফ ভাই আর আনিকা আপুর তিন বছরের কন্যা। যাই হোক, পরেরদিন কোথায় কোথায় ঘুরতে যাবো সেই প্ল্যান করতে লাগলাম সবাই। ইভা আপুর কাছ থেকে আগেই জেনেছি এথেন্স শহরে নাকি ছোট্ট একটা বাংলাদেশ আছে। মানে, অমেনিয়া নামের একটা জায়গার আশি শতাংশ মানুষ নাকি বাংলাদেশী, আর সেখানে বাঙালি হেন খাবার নাই যা পাওয়া যায় না। ঠিক হলো আমরা এথেন্সের সিটি সেন্টার ঘুরে তারপর বাঙালি পাড়ায় যাবো। রনি ভাই যদিও যেতে চাচ্ছিল না, উনার ভাষ্যমতে ঐ এলাকায় বাঙালিরা পান খেয়ে যেখানে সেখানে পানের পিচ ফেলে, উনি এই নোংরা জায়গায় যেতে নারাজ। আড্ডা শেষে সবাই যার যার রুমে চলে গেলো। যে নগরের প্রতিটি পরতে পরতে এত ইতিহাস, এত ঐশর্য্য লুকানো, আর মাত্র কিছু সময়ের ব্যবধানে সে নগরী ঘুরে দেখবো এই উত্তেজনা নিয়ে ঘুমাতে গেলাম আমিও। ঘুমাতে গিয়ে আবিষ্কার করলাম রুমের দরজায় ছিটকিনি নাই। বাসার মুল দরজা ছাড়া কোন রুমেই ছিটকিনি দেখলাম না, এমনকি টয়লেটেও দেখলাম আলাদা ভাবে ছিটকিনির ব্যবস্থা করা হয়েছে, এটা আপুরাই করেছে কিনা কে জানে।  পরবর্তিতে সান্তরিনী যেয়ে আমরা দুইটা হোটেলে থেকেছি, দেখলাম সেখানেও রুমের দরজায়, বাথরুমে কোন ছিটকিনির ব্যবস্থা নাই। এরা গোপনীয়তার ব্যাপারে এত উদাসীন কেন বুঝলাম না। দরজায় ছিটকিনি না থাকা নিয়ে বিব্রতকর গল্প পরের কোন পর্বে বলবো।

ট্যুরের এক রাত শেষ, পরদিন মানে একুশ তারিখ সকালে উঠে একটা জিনিস আবিষ্কার করলাম। আমরা যে বাসাটায় আছি, এ বাসার আশে পাশে যতগুলো বাড়ি দেখা যাচ্ছে, প্রতিটা বাড়ির বারান্দায় এক বা একেক অধিক সিডি ক্যাসেট ঝুলছে, এমনকি যে কয়টা বিশালাকার গাছ চোখে পড়ল, তাতেও সিডি ক্যাসেট ঝুলছে একটা করে।

………………চলবে।

Hi, I am Mahfuza Akter; a Bangladeshi girl. Currently living in Germany. I love to do some things like reading, traveling and learning as much as I can about a place before I even go there. May be you have never left your country or you are a fulltime traveller or dreamer. This virtual space is for those dreamers like me. Keep your eyes to my blog and find some inspiration to follow your dreams. If you have any questions, suggestions or comments feel free to contact me via Facebook. I would love having new friends!

Leave a Reply